বুধবার | ৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ | 23 September 2026
সময়: ৯:২৩ অপরাহ্ন
সংবাদ

১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশ দিয়ে ঢালাই, গ্রেফতার ১

📅 ৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ 🕒 ১:১১ পূর্বাহ্ন 👁 পাঠক: ১২১৪

টাঙ্গাইলে ১০ কোটি টাকার ব্রিজে রডের বদলে বাঁশ: জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর নানা উন্মোচন, সাব-ঠিকাদার গ্রেফতার ও জরুরি তদন্তের ডাক

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি ব্রিজে রডের পরিবর্তে কঞ্চির ব্যবহার ও চরম দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন এই ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রাতের আঁধারে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে লোহার রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছিল। স্থানীয় সচেতন জনগণের সময়োচিত পদক্ষেপে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়।

এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং সাথে সাথেই সাঁড়াশি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অভিযান চালিয়ে বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর এলাকা থেকেই অভিযুক্ত সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে (৪৪) গ্রেফতার করেছে বাসাইল থানা পুলিশ। এই জালিয়াতির প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ঘটনা খতিয়ে দেখতে গঠন করা হয়েছে জরুরি তদন্ত কমিটি।

ঘটনার পটভূমি ও স্থানীয়দের তৎপরতা
বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় নদীর ওপর একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ের এই বৃহৎ প্রকল্পে মূল ব্রিজের কাঠামোর পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য দুই পাশে ফুটপাত ও স্ল্যাব নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। 

কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই কাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের নিয়োজিত কর্মীরা কাজের গুণগত মান বজায় না রেখে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছিল। গত কিছুদিন ধরে সেতুর ওপরের ফুটপাত ও স্ল্যাব ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। দিনে রডের কাঠামো কিছুটা দেখা গেলেও রাতের আঁধারে অত্যন্ত গোপনে রডের বদলে বাঁশের চটা ও কঞ্চি বসিয়ে তড়িঘড়ি করে সিমেন্ট-বালুর প্রলেপ দিয়ে ঢালাই দেওয়া হচ্ছিল। 

গত সোমবার রাতে স্থানীয় কয়েকজন কৌতূহলী তরুণ ও সচেতন নাগরিক কাজের স্থানে গিয়ে ঢালাইয়ের ভেতরের অংশ পরীক্ষা করতেই থ বনে যান। সেখানে দেখা যায়, যেখানে ভারী লোহার রড ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নকশা ও সরকারি বাজেট ছিল, সেখানে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে সাজানো রয়েছে বাঁশের বাতা ও কঞ্চি। ঘটনার ভিডিও ও ছবি তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

সাব-ঠিকাদার গ্রেফতার ও বাসাইল থানায় মামলা
ঘটনাটি সামাজিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ। মঙ্গলবার দুপুরে বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর এলাকা থেকেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে এই জালিয়াতির মূল কারিগর ও কাজের সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করে। 

গ্রেফতারকৃত শাহ আলম (৪৪) রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা, তার বাবার নাম মৃত নবুর উদ্দিন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে এই ব্রিজের মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ পরিচালনা করে আসছিলেন।

জালিয়াতির এই ভয়াবহ ঘটনার পর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো বিলম্ব করা হয়নি। বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে বাসাইল থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করার অপচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার নিশ্চিতকরণ ও পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য
মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর কবির সরকারি মামলার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। 

ওসি আলমগীর কবির জানান, সরকারি মেগা প্রকল্পের কাজে এমন চরম অনিয়ম ও জালিয়াতি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি এবং জনগণের সুরক্ষাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলার শামিল। উপজেলা প্রকৌশলী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করার পরই পুলিশ চটজলদি পদক্ষেপ নিয়ে মূল অভিযুক্ত সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাসে সে কাজের অনিয়মের কথা স্বীকার করেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে এবং এ ঘটনার সাথে অন্য কারও প্ররোচনা বা যোগসাজশ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সরেজমিন পরিদর্শন
ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় মঙ্গলবার বিকেলেই ঢাকার কেন্দ্র থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাসাইলে ছোটেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক সরেজমিনে বাসাইলের মাইজখাড়া ব্রিজ পরিদর্শনে আসেন।

পরিদর্শনকালে তিনি ব্রিজের মান, বাঁশ দিয়ে করা বিতর্কিত ফুটপাত ঢালাইয়ের অংশ এবং মূল কাঠামোর নিরাপত্তা যাচাই করেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারি এত বড় একটা বাজেটের কাজে যারা এ ধরনের হীন জালিয়াতির পথ বেছে নিয়েছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এটি এলজিইডির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ঢালাই করা ভুয়া অংশগুলো দ্রুত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মূল কাঠামোর প্রতিটি ইঞ্চি নিখুঁতভাবে রি-চেক করা হবে।

জরুরি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
সরকারি টাকায় নির্মিত এই ব্রিজে জালিয়াতির শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা অনুসন্ধানে দ্রুততম সময়ে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইকবাল হোসেন। 

ইউএনও মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরিত সরকারি আদেশে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 
১. আহ্বায়ক: মো. আহাদি হোসেন (উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা - অতিরিক্ত)
২. সদস্য: রবিউল আলম (সহকারী প্রকৌশলী, বাসাইল পৌরসভা)
৩. সদস্য: মো. আলতাব হোসেন (উপসহকারী প্রকৌশলী, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর)

কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছাড়া অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করে এবং জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্তদের চিহ্নিত করে আগামী মাত্র একদিনের (২৪ ঘণ্টা) মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো ও কৈফিয়ত তলব
উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শুধু সাব-ঠিকাদারের ওপর দায় চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই প্রশাসন। যে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই ১০ কোটি টাকার কাজের দায়িত্ব পেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে।

ইতোমধ্যে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর থেকে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একটি জরুরি 'কারণ দর্শানো নোটিশ' (Show-Cause Notice) পাঠানো হয়েছে। নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে—কাজের তদারকিতে কেন এ ধরনের জালিয়াতি ঘটল এবং কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল ও কালোতালিকাভুক্ত (Blacklisted) করা হবে না। 

একই সাথে ব্রিজের ক্ষতিগ্রস্ত ও ত্রুটিপূর্ণ অংশ অবিলম্বে ভেঙে ফেলে নিজস্ব খরচে সরকারি নকশা অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ বা রেকটিফিকেশন করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও দাপ্তরিক গাফিলতির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিত কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।

সুশাসনের সংকট ও স্থানীয়দের দাবি
টাঙ্গাইলের বাসাইলে রডের বদলে বাঁশ দিয়ে ব্রিজের স্ল্যাব ঢালাইয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মাইজখাড়া ও আশেপাশের গ্রামের মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে এই অনিয়মের তীব্র প্রতিবাদ জানান। 

স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রায় ১১ কোটি টাকার এই প্রজেক্টের যদি এই অবস্থা হয়, তবে ব্রিজে মানুষ যাতায়াত শুরু করলেযেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। কেবল একজন সাব-ঠিকাদারকে গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়, যেসব সরকারি তদারকি কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীর গাফিলতির কারণে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকারি প্রকল্পে এমন জালিয়াতি করার সাহস কেউ না পায়।

বর্তমানে পুরো ব্রিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

← সব সংবাদে ফিরে যান