কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসার আড়ালে সাইবার অপরাধের স্বর্গরাজ্য: সিডিআর ও লোকেশন বেচাকেনা চক্রের শিকড় এবার চকরিয়ায়, ১৫ জন শনাক্তের পর ডিবির যৌথ অভিযান
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন নগরী কক্সবাজার। প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত থাকে এই অঞ্চল। তবে ঝলমলে হোটেল, রিসোর্ট আর সমুদ্রের এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এক অন্ধকার জগত। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনের আড়ালে মাদক কারবার, মানব পাচার, অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডির মতো অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিতি পেলেও, এবার তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ও ভয়াবহ এক সাইবার অপরাধ—নাগরিকের অতি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও পাচার।
সম্প্রতি চট্টগ্রামভিত্তিক তথ্য পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় একটি শক্তিশালী চক্র সাধারণ মানুষের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), লাইভ লোকেশন, সিমের বায়োমেট্রিক মালিকানা, বিকাশ লেনদেন এবং পাসপোর্ট ডেটাবেজের তথ্য চুরি করে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো গোপন গ্রুপে বিক্রি করে আসছিল। গ্রেপ্তারকৃত আসামীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে চকরিয়া এলাকার অন্তত ১৫ জন সক্রিয় সদস্যের সুনির্দিষ্ট পরিচয় খুঁজে পেয়েছে গোয়েন্দারা। এই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে বর্তমানে চট্টগ্রাম ডিবি বিভাগ ও বিশেষ ট্র্যাকিং টিমের যৌথ সমন্বয়ে কক্সবাজার ও চকরিয়াজুড়ে চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে।
পর্যটন নগরীর আড়ালে অপরাধের নতুন মাত্রা
কক্সবাজার ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে অপরাধীদের জন্য সবসময়ই অত্যন্ত সুবিধাজনক একটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশাল সমুদ্রসীমা, মায়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিদিন হাজার হাজার অচেনা মানুষের যাতায়াতকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অপরাধী চক্র পর্যটন ব্যবসার ছদ্মবেশ ধারণ করে। হোটেলের রুম বুকিং, ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা কটেজ ব্যবসার আড়ালে আড়ালে চলতে থাকে নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড।
বিগত বছরগুলোতে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) পাচার, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং হুন্ডি কারবারের প্রধান রুট হিসেবে কক্সবাজারের নাম বারবার উঠে এসেছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে এই অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতা কিংবা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই নিজেদের আড়াল করতে পারে। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে এবার গড়ে উঠেছে 'ডিজিটাল ডাটা ব্ল্যাকমার্কেট' বা তথ্য বিক্রির অবৈধ বাজার।
চকরিয়া কেন্দ্রিক চেইন: অনুসন্ধানে ১৫ জনের নাম
ঢাকা ও চট্টগ্রামের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে এনআইডি ও ডিজিটাল তথ্য জালিয়াতিতে জড়িত যেসকল আসামীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয়। এতেই মোড় ঘোরে পুরো তদন্তের। তদন্তে উঠে আসে, এই তথ্য পাচার ও সাইবার অপরাধের বিশাল নেটওয়ার্কের একটি প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা অপারেটিং হাব পরিচালিত হচ্ছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা থেকে।
চকরিয়া কেন্দ্রিক এই চক্রটির প্রায় ১৫ জন সক্রিয় সদস্যের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তারা বাইরে বিভিন্ন সাধারণ ব্যবসা, মোবাইল রিচার্জের দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী ও স্থানীয় ডার্কওয়েব সিন্ডিকেটের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল। চক্রটি অত্যন্ত গোপনে টেলিগ্রামের এনক্রিপ্টেড চ্যানেল ও মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে 'তথ্য বিক্রির ডিজিটাল হাট' খুলে বসেছিল।
কীভাবে কাজ করত এই চক্র?
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, এই তথ্য পাচার চক্রের কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত নিখুঁত ও ভয়াবহ। তারা সাধারণত কয়েকটি ধাপে তাদের কাজ পরিচালনা করত:
১. তথ্য সংগ্রহ ও সার্ভার অ্যাক্সেস: টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস প্রদানকারী সংস্থা কিংবা সরকারী ডাটাবেজের সরাসরি অ্যাক্সেস রয়েছে—এমন কিছু অসৎ ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে গোপন আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে এরা তথ্য হাতিয়ে নিত।
২. গ্রাহক শিকার ও বিজ্ঞাপন: সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলোতে চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো—"যেকোনো নম্বরের কল লিস্ট, লোকেশন ও কল রেকর্ড পান মাত্র ১০ মিনিটে।" অপরাধী, ব্ল্যাকমেইলার, পরকীয়া সন্দেহে থাকা ব্যক্তি, কিংবা জমিজমা সংক্রান্ত শত্রুতা থাকা লোকজন এসব চক্রের মূল গ্রাহক ছিল।
৩. চড়া দামে বেচাকেনা: ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হতো একেকটি তথ্যের জন্য। বিশেষ করে টার্গেট ব্যক্তির 'লাইভ লোকেশন' বের করে দেওয়া হতো মাত্র কয়েক মিনিটের নোটিশে।
৪. ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডিতে লেনদেন: লেনদেনের ক্ষেত্রে পুলিশের নজরদারি এড়াতে তারা বিকাশ বা নগদ ছাড়াও রেডটপে বা ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন ইউএসডিটি) এবং হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করত।
ডিবি ও যৌথ অভিযানের সর্বাত্মক প্রস্তুতি
চকরিয়ার ওই ১৫ জন সদস্যের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম ডিবি বিভাগের নেতৃত্বে একটি বিশেষ যৌথ অভিযান টিম ইতোমধ্যেই কক্সবাজার ও চকরিয়া অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে।
ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপরাধীরা তথ্যপ্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় তারা বারবার নিজেদের আইপি অ্যাড্রেস ও লোকেশন পরিবর্তন করছে। তবে আধুনিক ট্র্যাকিং সলিউশন ও সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে তাদের প্রতিটি মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই একটি বড় ধরনের ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে এই চক্রের ১৫ সদস্য সহ মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
নাগরিক নিরাপত্তা ও জাতীয় সুরক্ষায় মারাত্মক হুমকি
কক্সবাজারের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এই ধরনের সাইবার অপরাধ চক্রের বিস্তার কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং জাতীয় সুরক্ষার জন্যও মারাত্মক হুমকি। কারণ, সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলে দেশি-বিদেশি অপরাধী, মানব পাচারকারী এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আনাগোনা রয়েছে। যদি সামান্য অর্থের বিনিময়ে যেকোনো নাগরিক বা দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার লোকেশন ও কল রেকর্ড অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যায়, তবে অপহরণ, ব্ল্যাকমেইলিং এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গের মতো বড় দুর্ঘটনা ঘটা কেবল সময়ের ব্যাপার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া বার্তা
চট্টগ্রাম ডাবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পর্যটন বা অন্য কোনো ব্যবসার আড়ালে অপরাধ করার দিন শেষ। সাইবার অপরাধ এবং তথ্য পাচারের বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। চকরিয়ায় শনাক্ত হওয়া ১৫ জন সদস্যের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। একই সাথে যেসকল প্রতিষ্ঠান বা টেলিকম অপারেটরের লোকজনের গাফিলতি বা যোগসাজশ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও দেশের প্রচলিত কঠোর আইনে মামলা দায়ের করা হবে।
বর্তমানে ডিবির সাঁড়াশি অভিযানে চকরিয়া ও কক্সবাজারের অপরাধীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত এই সাইবার সিন্ডিকেটকে নিশ্চিহ্ন করা না গেলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে।